আমি ইতিহাসের এক গল্প বলতে বসেছি।
আমার কথাটা গল্প করে বলছি বলেই যে সেটা ইতিহাস নয়, এ-কথা কেউ যেন মনে না করেন। কেননা, নিছক বানিয়ে-বানিয়ে কাহিনী রচনা করার মতোন কল্পনাশক্তি আমার মোটেই নেই। তা ছাড়া, আমি যে-সময়ের কথা বলতে উদ্যত হয়েছি, সে-সময়কার সমস্ত ঘটনার নাড়ি-নক্ষত্রের খবর ইতিহাসের বড়-বড় পুঁথির পাতায়-পাতায় আগাগোড়া বেশ খোলাখুলিভাবে লেখা আছে। যে-কেউ যখন ইচ্ছে সেই-সব বই ঘেঁটে পরিষ্কার যাচিয়ে নিতে পারবেন যে আমি যা বলছি সেটা ইতিহাস কি না। তাই, এটা গল্প হলেও যে সত্যি গল্প এটুকু আমি নির্ভয়ে বলতে পারি।
তবে ওর মধ্যে একটু কথা আছে। আজকালকার পণ্ডিতেরা বলে থাকেন, ইতিহাসের বই হলেও সেগুলো আর পূর্বের মতো যা-হোক তা-হোক করে লিখে গেলে চলবে না। কেবল কতকগুলো নাম-ধাম সন-তারিখ ঠিকঠাক বসিয়ে দিয়ে গেলেই, কিংবা ফুটনোট অ্যাপেন্ডিক্স দিয়ে বইটাকে ভারাক্রান্ত করলেই যে সেটা একটা ভালো ইতিহাসের গ্রন্থ হয়ে উঠবে, তা নয়।
অর্থাৎ, সোজা কথায়, ইতিহাস হলেও সেটা পড়তে পারা চাই সরস নাটক-নভেলের মতো। বেশ আরাম করে রসিয়ে রসিয়ে তারিয়ে-তারিয়ে সহজে পড়তে না পারলে ইতিহাসের বই লেখা বৃথা; কেউ সেটা আগ্রহ করে পড়তে চাইবে না। তখন সে-বই নিয়ে একটা টেক্সট্-বুক করা যেতে পারে বটে, কিন্তু সেটাকে একটা পড়বার মতো ইতিহাসের পুঁথি বানাতে পারা যাবে না।
সম্প্রতি আরো একটা রব উঠেছে। আমাদের সমস্ত ইতিহাস-রচনা নাকি এ-পর্যন্ত ভুল পদ্ধতিতে হয়ে এসেছে। এখন একেবারে নতুন ধারায় ইতিহাস লিখতে হবে। ইতিহাস বলতে স্বভাবতই আমাদের মনে শুধু রাজা-বাদশার যুদ্ধ-বিগ্রহের বিপ্লব-ষড়যন্ত্রের কথাই জাগে; ইতিহাস মানে, সে-সবেরই বিস্তৃত বিবরণ। কিন্তু এ-ইতিহাস তো নিতান্ত একপেশে ব্যাপার। মানুষের বিরাট জীবন-প্রবাহের সঙ্গে এর সম্বন্ধ কতটুকু? মানুষের দিনকের-দিনের জীবনযাত্রার কথা, তার সুখ-দুঃখের আশা-ভরসার কথা, তার খাওয়া-পরার কথা, ধর্ম-কর্মের কথা, শিল্প-কারুকার্যের কথা, এই-সবের কথাই তো হল আসল ইতিহাস।....