নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিভা কালের পৃষ্ঠায় নিজস্ব স্বাক্ষর উজ্জ্বল করে তুলেছে। নারায়ণ শুধু প্রতিভাবানই নন, সমসাময়িক যুগের প্রতিনিধিস্থানীয়ও বটেন। হঠাৎ- আলোর ঝলকানিতে পাঠকচিত্তকে চকিত বিস্মিত করে তাঁর আবির্ভাব নয়, তাঁর উদয়াচল নিঃশব্দ মহিমায় নতুন নক্ষত্রের ধ্রুবজ্যোতিতে ক্রমশ-ভাস্বর হয়ে উঠেছে। ছোটগল্পে বঙ্গভারতী আজ ষড়ৈশ্বর্যময়ী, এই বিরাট ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকারক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে মহত্তর সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে তিনি ভাষা দিয়েছেন। রূপে ও রসে, ভাবনায় ও বেদনায় বিচিত্র তাঁর শিল্পলোক। নব নব উন্মেষশালিনী তাঁর প্রতিভা নব নব দিগন্তে সাহিত্যের ক্ষেত্রকে অনুক্ষণ প্রসারিত করে চলেছে। পটভূমি ও পরিবেশ রচনায় তাঁকে আঞ্চলিক না বলে সাবভৌমিক বলাই সমীচীন। পৃথিবীর প্রথম প্রাণশক্তির শ্যামায়িত আদিম প্রকাশ ডুয়ার্স-টেরাই-আরাকানের হিংস্র অরণ্যভূমি থেকে নিম্নবঙ্গের নদীমোহনায় সমুদ্রগর্ত হতে সদ্যোখিত নোনামাটির চরে মানুষের নতুন উপনিবেশ পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি সমভাবে প্রসারিত কখনো পদ্মা-মেঘনা-কালাবদর -আড়িষলখার তিমিরতীর্থে জীবনতরঙ্গ উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে, কখনো আত্রাই-মহানন্দা-কাঞ্চন-নদীর কূলে কূলে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উচ্চকিত হয়েছে জনচেতনা। কখনো মহাস্থান-কোটিবর্ষ- পৌণ্ড্রবর্ধনের ধ্বংসস্তূপ নবজীবনের তাণ্ডবে মন্দ্রমুখর, কখনো পুরাতন তাম্রলিপ্তের মাটিতে রচিত হচ্ছে নতুন যুগের বীরমল্লদের ইতিহাস। পশ্চিম সীমান্ত থেকে মহুয়ানদীর গন্ধে ভেসে এসেছে নীল পাহাড়ে ঘেরা সাঁওতাল পরগাণার অপূর্ব বনশ্রী, আবার উত্তর-দিক্চক্রবালে পারের তলায় দেখা দিয়েছে সিংহবাদের হিজল-বন বরেন্দ্রভূমির লালমাটি।