ভূমিকা:
অল্পবয়সে বুদ্ধদেবের একটি লাইন নিয়ে আমরা কৌতুক করেছি খুব। মাত্র চল্লিশেই কেন উনি বিলাপ করবেন 'আমি বুড়ো, প্রায় বুড়ো, কী আছে আমার আর তীব্র তেতো মত্ত স্মৃতি ছাড়া? এই ছিল হাসাহাসির বিষয়। কিন্তু এখন, ওই বয়সে পৌঁছবার আর সামান্যই যখন বাকি, এখন যেন টের পাওয়া যায় শব্দগুলির ভিতরকার লাঞ্ছনা। কৌতুকটা বুঝি ফিরিয়ে নিতে হলো আজ।
আরো তা ফিরিয়ে নিতে হলো গোপীমোহনবাবুর 'শ্রেষ্ঠ কবিতার ডাক শুনে। সহৃদয় তার আহ্বান, সাহসিক। কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবিতা? শুনে মনে হয় যেন পরীক্ষাঘরের শেষ ঘণ্টা বেজে উঠল। এই কি আমাদের অবসান তবে? আমরা তো ভাবছিলাম আরো অনেক বাকি আছে। এগিয়ে-পিছিয়ে খেলা, অনেক নতুন করে শুরু কিংবা নতুন করে ছাড়া। তাহলে তা নয়?। সত্যি বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতার। কিন্তু জীবিকাবশে শ্রেণীবশে এতই আমরা মিথ্যায় জড়িয়ে আছি দিনরাত যে একটি কবিতার জন্যেও কখনো-কখনো অনেকদিন থেমে থাকতে হয়। উপরন্তু আমি যে আধুনিকতার কথা ভাবি সেখানে মন্থর পুনরাবৃত্তির কোনো। মানে নেই, অবাধ প্রগম্ভতার কোনো প্রশ্রয় নেই। তাই কম লিখি বলে আমার ভয় হয় না। আমার ভয় কেবল এই যে সমস্তটা মিলিয়ে আদ্যন্ত একটিই-যে নাটক গড়ে উঠবার কথা ছিল, আজও তার অবয়ব দেখতে পাই না স্পষ্ট। বলা হয় না কিছু' এখনও রয়ে গেল পুরোনো সেই নিষ্ফলতার বোধ। এ সংকলনের সবচেয়ে প্রাচীন লেখা "কবর”, সবচেয়ে নতুন "ভূমধ্যসাগর" মধ্যবর্তী ঠিক কুড়ি বছরের সময় থেকে সাজিয়ে নিতে গিয়ে দেখি, হতাশা ছাড়া হাতে থাকে না কিছুই।। তাই, শ্রেষ্ঠ কবিতা বলার কোনো মানে নেই একে।
এই বইটির দ্বাদশ সংস্করণ বেরিয়েছিল ১৪১৫ সালের বৈশাখে। সেই পর্যন্ত প্রায় সব মুদ্রণেই অনিবার্যত কিছু গ্রহণ-বর্জন ঘটেছে, নতুন কবিতা-বইয়ের লেখাগুলির জন্য খানিকটা জায়গা রাখবার দায়ে। কিন্তু তারপর থেকে এ দশবছর সময়ের মধ্যে, পরবর্তী নয়টি মুদ্রণে, বইটির আর কোনোই বদল ঘটেনি। নতুন এই সংস্করণে সংযোজনের পরিমাণ তাই একটু বেশিই। 'মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি' থেকে 'এও এক ব্যথা-উপশম' পর্যন্ত সাতখানি বইয়ের অল্পকিছু কবিতা যুক্ত হয়েছে এখানে। এই সংস্করণেও কয়েকটি নতুন লেখা রইল 'সীমান্তবিহীন দেশে দেশে' বইটি থেকে। 'ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার' থেকে একটি সংযোজনও রইল শেষে।