মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা ও আলোর ভুবন প্রকাশনীর বই "পুতুল নাচের ইতিকথা | Buy this book at 173 BDT from বইসদাই - boisodai.com | Bangladesh | বইপোকা
উপন্যাসের আরম্ভটা পাঠককে ঝাকিয়ে দেয়। বাহত মৃত হারু ঘোষ জঙ্গলের প্রান্তে খালের ধারে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছিল, ঠিক যেভাবে বজ্রপাতের আগের মুহূর্তে সে গাছের তলায় বৃষ্টি থেকে আড়াল পাবার জন্য দাঁড়িয়েছিল। দুর্ঘটনায় মৃত্যু, তবে যেভাবে লেখক বর্ণনা করেছেন বিমূঢ় হতে হয় তাতে— বটগাছের ঘন ছায়ায় বেশিক্ষণ বৃষ্টি আটকাইল না। হারু দেখিতে দেখিতে ভিজিয়া উঠিল। স্থানটিতে ওজনের ঝাঁঝালো সামুদ্রিক গন্ধ ক্রমে মিলাইয়া আসিল। অদূরের ঝোপটির ভিতর হইতে কেয়ার সুমিষ্ট গন্ধ ছড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। সবুজ রঙের সরু লিকলিকে একটা সাপ একটি কেয়াকে পাকে পাকে জড়াইয়া ধরিয়া আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। পায়ে বৃষ্টির ভাল লাগায় ধীরে ধীরে পাক খুলিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল। ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্য দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইয়া গেল। হারুর স্থায়ী নিস্পন্দতায় সাহস পেয়ে একটি কাঠবিড়ালি গাছের উঁচু ডাল থেকে নিচে নেমে এল, গিরগিটি পোকা ধরার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল। এবং মরা শালিকের বাচ্চাটিকে মুখে করিয়া সামনে আসিয়া ছপছপ করিয়া পার হইয়া যাওয়ার সময় একটা শিয়াল বারবার মুখ ফিরাইয়া হারুকে দেখিতে লাগিল। ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে? একটা মানুষের নৈসর্গিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং তাকে ঘিরে প্রকৃতিতে প্রাণলোকে বিকারে-নির্বিকারে প্রতিক্রিয়ার এই ছবি যেন নব্য কবিতার ইমেজারি। কিন্তু এই পর্যন্ত। বড় জোর মানবলোকে এই মৃত্যু নিয়ে যে অনুচ্ছ্বসিত মমতার স্পর্শ তার সঙ্গে মিলে প্রসঙ্গটি সমে এসে থামল। ওদিকে পাঠকের মনে প্রত্যাশা জাগে উপন্যাসে এই ঘটনার গুরুতর প্রভাব পড়বে। হারুর মেয়ে মতি, পুত্র পরাণ, পুত্রবধূ কুসুম উপন্যাসের মুখ্য পাত্রপাত্রীর মধ্যে পড়ে। কিন্তু হারুর মৃত্যুশোককে লেখক দিন সাতেকের বেশি স্থায়ী করেননি। এমন একটা ব্যাপার তৈরি করেও তাকে কাজে লাগালেন না লেখক।