নাগমা-ই-গালিব মির্জা গালিব। উর্দু সাহিত্যের ‘শায়ের-এ-আজম’ নামে খ্যাত এক চির অম্লান প্রতিভা। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে আছে প্রেমের মাধুর্য, বেদনার গভীরতা এবং জীবনের সূক্ষ্ম দর্শন। কখনো তা হৃদয়ের নিভৃত আর্তনাদ, কখনো বা আত্মার অন্তর্লীন অনুভূতির নীরব ভাষা। গালিবের শব্দগুলো যেন এক গভীর অন্তর্জগতের দর্পণ। গালিবের অনবদ্য সেসব কবিতার নির্বাচিত অংশ নিয়ে শীঘ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এক অনন্য সংকলন— নাগমা-ই-গালিব। খুব শিগগিরই বইটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বই অঙ্গন প্রকাশনী থেকে। বইটির সংকলন ও অনুবাদ করেছেন খ্যাতিমান অনুবাদক আহমেদ মুসাফির। যারা গালিবকে ভালোবাসেন, তাঁর শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতির গভীরে ডুব দিতে চান, তাদের জন্য এই বই হৃদয়ের নীরব আলাপচারিতার এক বিশ্বস্ত ঠিকানা। মির্জা গালিব কহেন মির্জা গালিব কহেন বইটিতে তাঁর শায়েরির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁর শেরগুলোর সুন্দর করে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা করেছেন মারুফ রুসাফী। মির্জা গালিব এর শায়েরী সাথে সুন্দর সুন্দর ব্যাখ্যাসহ খুব শীঘ্রই আসছে "মির্জা গালিব কহেন" মেহফিল এ ওয়াসিক “উর্দু সাহিত্য এমন এক সুনেহরা নহর— যেখানে একবার ডুব দিলে আর ফিরে আসার ডাক কানে পৌঁছায় না।” গজল, হামদ-নাত, মেহফিল, মাওলিদ— এ সকল শব্দ, রীতি ও রেওয়াজের সঙ্গে আমার পরিচয় বলা যায় শৈশব থেকেই। আমার বেড়ে ওঠা ছিল এমনই এক রুহানী পরিবেশে; বস্তুবাদের চেয়ে আধ্যাত্মিকতাই জড়িয়ে ছিল যার হাওয়া-জলের পরতে পরতে। আমার মরহুম নানাজান ও তাঁর পরিবার ছিলেন সুফি ভাবধারার মানুষ। জিকিরে, সুরে, ছন্দে— স্রষ্টাকে কীভাবে সারাক্ষণ অনুভবে ও স্মরণে রাখা যায়, তা আমি তাঁদের থেকেই দেখেছি। নানাজানের মুখে শোনা একখানা গজল আজও আমার কানে বাজে, যার দুটি লাইন— “সাধক মনোরে সদায় থাকো যোগ ধিয়ানে (ধ্যানে), যোগ ধিয়ানে জ্ঞানও বাড়ে, রাইখো মাওলা স্মরণে।” আমি বিশ্বাস করি, ছন্দ, কবিতা ও ভাবের প্রতি আমার যে অনুরাগ— আমার এই সাধনা— তার শেকড়ও সেই রুহানী জমিনের গভীরেই প্রোথিত। আমার সাহিত্যপিয়াসী মন সদা সেই ধিয়ানেই খুঁজে ফেরে মানুষের অন্তরাত্মার আনন্দ-বেদনা, প্রার্থনা-আকুতির সালতামামি। আর এই লাগাতার সৌন্দর্যের সন্ধানই আমাকে একদিন টেনে নিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের এক আশ্চর্য আসর— “উর্দু গজল-কবিতার মেহফিলে।” উর্দু সাহিত্য এমন এক সুনেহরা নহর— যেখানে একবার ডুব দিলে আর ফিরে আসার ডাক কানে পৌঁছায় না। ‘মেহফিল-এ-ওয়াসিক’— আমার এই কিতাবখানা প্রকাশের উদ্দেশ্যও মূলত, আমি যে অপার সৌন্দর্যের খাজানা পেয়েছি— স্থান ও কালের সীমানা ভেঙে তার উদযাপনে আমার প্রিয়জনদের শামিল করা। বইটি আমি সাজিয়েছি কবিতার মেহফিল বা মুশায়রার ঢঙে। নিজেকে ‘নাজিম’ বা উপস্থাপক পরিচয় দিয়ে পাঠকদের স্বাগত জানানো, শায়েরদের আমন্ত্রণ, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, চা-বিরতি, বিদায়পর্বসহ— সর্বোপরি মুশায়রার ক্রম ও আবহ বর্ণনার মাধ্যমে চেয়েছি পাঠকদের মানসপটে উনিশ শতকের এক জাঁকজমকপূর্ণ মুশায়রার অভিজ্ঞতা তৈরি ও তার প্রতিচ্ছবি আঁকতে। সেই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উর্দু ভাষা উদ্ভবের ইতিহাস, শের-শায়েরির গঠনরীতি ও উপাদান, মুশায়রা এবং অন্যান্য সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়েও আলোকপাত করেছি। উর্দু শের-শায়েরির ক্লাসিক কিংবদন্তি মীর তকি মীর, মির্জা গালিব, আকবর এলাহাবাদি থেকে শুরু করে সমকালীন জনপ্রিয় শায়ের আহমেদ ফারাজ, জউন এলিয়া, বশির বদরসহ প্রায় ২৫-এর অধিক খ্যাতনামা শায়েরদের বেশ কিছু শের-শায়েরি ও তার বাংলা ভাবানুবাদ রেখেছি। আমার জ্ঞানস্বল্পতায় অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে গিয়ে থাকতে পারে— সে সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে এড়িয়ে বাকি নিবেদনটুকু আমার অগ্রজ ও অনুজ সকল পাঠকজনের ভালো লাগবে— এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি। প্রিয়জনেরা আমার বিদায়বেলায় তবে মানবমনের সীমাহীন আশা-প্রত্যাশা নিয়ে মির্জা গালিবের বিখ্যাত শের গুনগুনিয়েই শেষ করছি— “হাজারো এমন ইচ্ছে ছিল আমার চাইতে গিয়ে বের হয়েছে দম। অনেক তার পূরণ হয়েছে বটে — তবু লাগে তাহাও যেন কম।”