
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিসর্জন' নাটকটি তাঁর 'রাজর্ষি' উপন্যাসের নাট্যরূপ। এটি মূলত অন্ধ সংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মানবিকতার মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটি সার্থক চিত্রায়ন।
নিচে নাটকটির সারমর্ম সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
মূল কাহিনী ও দ্বন্দ্ব
নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমাণিক্য এবং মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রঘুপতির আদর্শিক সংঘাত। মন্দিরে পশুবলি দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত।
রাজার অবস্থান: এক বালিকার (অপর্ণা) পোষা ছাগলকে বলি দেওয়ার করুণ দৃশ্যে বিচলিত হয়ে রাজা গোবিন্দমাণিক্য রাজ্যে চিরতরে পশুবলি নিষিদ্ধ করেন। তাঁর কাছে জীবপ্রেমই হলো প্রকৃত ধর্ম।
পুরোহিতের অবস্থান: রঘুপতি এই আদেশকে শাস্ত্রবিরোধী এবং দেবীর অবমাননা বলে মনে করেন। তাঁর কাছে বংশপরম্পরায় চলে আসা রক্তক্ষয়ী বলিদানই হলো শক্তির আরাধনা।
নাটকীয় মোড়
রঘুপতি রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এমনকি তিনি রাজভ্রাতা নক্ষত্রমাণিক্যকে প্ররোচিত করেন রাজাকে হত্যা করার জন্য। রঘুপতি দাবি করেন যে, দেবী স্বপ্নে তাঁর কাছে 'রাজরক্ত' চেয়েছেন।
এই ষড়যন্ত্রের আবর্তে পড়ে রঘুপতির পালিত পুত্র জয়সিংহ, যে রাজাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা করত এবং রঘুপতিকে দেবতুল্য মানত। সত্য ও মিথ্যার এই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে জয়সিংহ শেষ পর্যন্ত আত্মাহুতি দেয়। সে নিজের রক্ত দেবীর চরণে উৎসর্গ করে প্রমাণ করে দেয় যে, পাথরের প্রতিমা আসলে রক্ত তৃষ্ণার্ত নয়।
সমাপ্তি
জয়সিংহের মৃত্যু রঘুপতির চোখ খুলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, যে দেবীর নামে তিনি এত রক্তপাত ঘটিয়েছেন, সেই দেবী আসলে পাথরের প্রতিমার আড়ালে নেই। পরম অনুশোচনায় তিনি প্রতিমা বিসর্জন দেন। জয়সিংহের আত্মত্যাগ আর অপর্ণার অকৃত্রিম ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, আর বিসর্জিত হয় মানুষের ভেতরের হিংসা ও অন্ধ অহংকার।
লেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশক: শব্দচাষ প্রকাশ